নতুন মাসের শুরুতে বা পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার পর আমরা অনেকেই রঙিন কলমে একটা নিখুঁত রুটিন বানাই — ভোর পাঁচটায় ওঠা, দিনে দশ ঘণ্টা পড়া। তিন দিন পর সেই রুটিন দেয়ালেই থেকে যায়। রুটিন ভেঙে যায়, কারণ সেটা বানানো হয় একজন কাল্পনিক মানুষের জন্য; তোমার আসল দিনটার জন্য নয়।
আগে নিজের দিনটা মাপো
রুটিন লেখার আগে দুই-তিন দিন শুধু খেয়াল করো, সময় কোথায় যাচ্ছে। স্কুল বা কলেজ, কোচিং, যাতায়াত, খাওয়া, ঘুম, খেলা — এগুলো বাদ দিলে পড়ার জন্য সত্যিকারের কত ঘণ্টা থাকে? বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে সেটা যতটা ভাবা হয় তার চেয়ে কম, আর সেটাই স্বাভাবিক। রুটিন বানাতে হবে ওই বাস্তব সময়টুকু নিয়ে।
সময় নয়, কাজ লেখো
"সন্ধ্যা ৭টা–৯টা: গণিত" লিখলে দুই ঘণ্টা বই খুলে বসে থাকলেও রুটিন মানা হয়ে যায়। এর বদলে লেখো কী শেষ করবে: "অনুশীলনীর ১ থেকে ১২ নম্বর অঙ্ক"। কাজ শেষ হলে নিজেই বুঝবে দিনটা সফল হয়েছে কি না।
কোন সময়ে কোন পড়া
সব পড়া এক রকম শক্তি চায় না। নিজের মাথা কখন সবচেয়ে সতেজ থাকে — কারও ভোরে, কারও রাতে — সেটা খুঁজে বের করো এবং সেই সময়টা সবচেয়ে কঠিন বিষয়ের জন্য রাখো।
- সতেজ সময়: গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, নতুন ও কঠিন অধ্যায়।
- মাঝারি সময়: পড়ে বোঝার বিষয়, নোট তৈরি, লেখার অনুশীলন।
- ক্লান্ত সময়: রিভিশন, শব্দার্থ, MCQ অনুশীলন, পরের দিনের পরিকল্পনা।

একটি নমুনা রুটিন
নিচের রুটিনটা স্কুল বা কলেজ খোলা থাকার দিনের জন্য একটা উদাহরণ মাত্র। সময়গুলো নিজের দিনের সাথে মিলিয়ে বদলে নাও।
| সময় | কাজ |
|---|---|
| ভোরে ৪০ মিনিট | আগের দিনের পড়া বই বন্ধ রেখে মনে করা |
| সকাল থেকে দুপুর | স্কুল বা কলেজ |
| বিকেল | বিশ্রাম, খেলা বা হাঁটা |
| সন্ধ্যায় প্রথম পর্ব | সবচেয়ে কঠিন বিষয় — নির্দিষ্ট একটি কাজ |
| ছোট বিরতি | নাশতা, পরিবারের সাথে সময় |
| রাতে দ্বিতীয় পর্ব | দ্বিতীয় একটি বিষয় ও ক্লাসের বাড়ির কাজ |
| ঘুমের আগে ১৫ মিনিট | ২০টি MCQ, তারপর পরদিনের তিনটি কাজ লিখে রাখা |
সব বিষয় যেন পালা পায়
পছন্দের বিষয় বারবার পড়া আর অপছন্দের বিষয় ফেলে রাখা — রুটিন না থাকলে এটাই হয়। সপ্তাহের শুরুতে সব বিষয়ের তালিকা করো এবং দেখো প্রতিটি বিষয় অন্তত দুই দিন জায়গা পাচ্ছে কি না। দুর্বল বিষয়কে প্রতিদিন অল্প সময় দাও; সপ্তাহে একদিন তিন ঘণ্টা দেওয়ার চেয়ে প্রতিদিন আধা ঘণ্টা অনেক বেশি কাজের। একই দিনে একটি অঙ্কনির্ভর আর একটি পড়ানির্ভর বিষয় রাখলে একঘেয়েমিও কম লাগে। পরীক্ষা কাছে এলে নতুন পড়া কমিয়ে রিভিশন আর মডেল টেস্টের সময় বাড়াও।
বিরতি, ঘুম আর ফোন
- টানা পড়ার চেয়ে ২৫–৪০ মিনিট পড়ে ৫–১০ মিনিটের বিরতি বেশি কার্যকর।
- ঘুম কমিয়ে পড়ার সময় বাড়ালে পরের দিনের পড়া মনে থাকে না। রাতের ঘুমকে রুটিনের অংশ হিসেবে ধরো।
- পড়ার সময় ফোন অন্য ঘরে রাখো। অ্যাপে পরীক্ষা দিতে হলে আগে সেটাই দাও, তারপর ফোন সরিয়ে রাখো।
- খেলাধুলা বা হাঁটা সময়ের অপচয় নয় — এতে মনোযোগ ফিরে আসে।
সপ্তাহে একবার হিসাব মেলাও
প্রতি সপ্তাহের শেষে দশ মিনিট সময় নিয়ে দেখো: কোন কাজগুলো হয়েছে, কোনগুলো হয়নি, কেন হয়নি। যে কাজ বারবার বাদ পড়ছে, সেটা হয় খুব বড় করে লেখা, নয়তো ভুল সময়ে রাখা। কাজটা ছোট করো বা সময় বদলাও। সপ্তাহে অন্তত আধা দিন ফাঁকা রাখো — জমে থাকা পড়া শেষ করার জন্য।

রুটিন ভেঙে গেলে
অসুখ, অনুষ্ঠান, লোডশেডিং — কোনো না কোনো দিন রুটিন ভাঙবেই। তখন পুরো রুটিন বাতিল না করে একটা নিয়ম মানো: পরপর দুই দিন বাদ নয়। খারাপ দিনেও অন্তত সবচেয়ে জরুরি একটি কাজ শেষ করো। আগের দিনের বাকি পড়া পরদিনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিনটাকে অসম্ভব করে তুলো না; সেটা সপ্তাহের ফাঁকা সময়ে নিয়ে যাও।
ভালো রুটিন সেটাই, যেটা খারাপ দিনেও অর্ধেকটা মানা যায়।
আজই শুরু করতে চাইলে তিনটি কাজ করো: আগামীকালের জন্য তিনটি নির্দিষ্ট কাজ লেখো, কোন সময়ে করবে ঠিক করো, আর রাতে মিলিয়ে দেখো। এক সপ্তাহ পর রুটিনটা তোমার নিজের মতো করে গড়ে উঠবে।